খুদে পানার মতো একধরনের জলজ ফার্ন হলো অ্যাজোলা। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের কৃষকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই অ্যাজোলার ব্যবহার। কেউ ধানি জমিতে অ্যাজোলা ব্যবহার করছেন সার হিসেবে। কেউ আবার পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার হিসেবে খাওয়াচ্ছেন গবাদিপশু, মাছ ও হাঁস-মুরগিকে।

মিরসরাই উপজেলার মঘাদিয়া ইউনিয়নের তিনঘরিয়াটোলা গ্রামের কৃষক দিলীপ কুমার নাথ। গত আমন মৌসুমে বাড়ির পাশের ১০ শতাংশ জমিতে ধান লাগিয়ে তাতে ব্যবহার করেছিলেন প্রাকৃতিক সার অ্যাজোলা। সেই জমিতে আর কোনো ধরনের কৃত্রিম সার ব্যবহার না করেই তিনি ধানের ভালো ফলন পেয়েছেন। এতে ধান চাষে খরচ কমে আসায় তাঁর লাভ হয়েছে বেশি।

কৃষক দিলীপ কুমার নাথ প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৩ সাল থেকে নিজের ধানখেতে অ্যাজোলার ব্যবহার করছেন তিনি। তখন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা রঘুনাথ নাহার পরামর্শে ধানখেতে অ্যাজোলা সার ব্যবহার শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘জমিতে আর কোনো কৃত্রিম সার ব্যবহার না করেও অন্য কৃষকদের সমান ধান পেয়েছি। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় আমার লাভ হয়েছে বেশি। এখন নিজের ধানখেতে ব্যবহার করতে এবং অন্য কৃষকদের দিতে বাড়ির একটি পুকুরে অ্যাজোলা সংরক্ষণ করছি।’

শুধু দিলীপ কুমার নন, মিরসরাইয়ে তাঁর মতো অনেকেই এখন অ্যাজোলা চাষ করেন। তাঁদেরই একজন তরুণ কৃষক ফজলে নূর ফাহিম। উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নে তাঁর একটি পশুর খামার রয়েছে। মূলত খামারের পশুদের খাদ্যের চাহিদা পূরণে অ্যাজোলা চাষের উদ্যোগ নেন তিনি। চাষ করেছেন খামারের পাশে একটি চৌবাচ্চায়। ফাহিম বলেন, অ্যাজোলা অতি সহজে, প্রায় বিনা খরচে উৎপাদন করা যায়। এমন প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ পশুখাদ্য আর হতে পারে না।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, অ্যাজোলা সার এখনো অনেকটাই অপরিচিত। এই প্রাকৃতিক সার উচ্চ প্রোটিন ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এটি গবাদিপশু, মাছ ও হাঁস–মুরগির খাদ্য হিসেবে সহজেই ব্যবহার করা যায়। অ্যাজোলা বাতাস থেকে নাইট্রোজেন নিয়ে তা পাতায় সংরক্ষণ করে ধীরে ধীরে মাটিতে যোগ করে। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় আদি কৃষিতে অ্যজোলার ব্যবহার ছিল।

হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে স্বল্প পানিতে অ্যাজোলার উৎপাদন ভালো হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে অ্যাজোলা দ্বিগুণ হতে পারে। মৌসুমে প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৭০ কেজি বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন মাটিতে মেশাতে পারে এটি। ধানখেতে অ্যাজোলা ব্যবহারের ফলে মিথেন ও নাইট্রিক অক্সাইড গ্যাসের উৎপাদন কমে যায়। এর ফলে গ্রিনহাউজ প্রভাব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এটি। পাশাপাশি মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির পিএইচ সংশোধন করে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি ও অনুজীবের কার্যাবলি বাড়ায়। পাশাপাশি মাটিতে পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে অ্যাজোলা। শুকনা অবস্থায় এতে ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ প্রোটিন, ১০-১৬ শতাংশ ফাইবার, ২.৫-৬.৫ শতাংশ ফ্যাট এবং ১০-২৫ শতাংশ মিনারেল থাকে।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পদে দায়িত্ব পালন করা রঘুনাথ নাহার পরামর্শে উপজেলার অনেক কৃষক ও খামারি অ্যাজোলার ব্যবহার ও চাষ শুরু করেন। বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত উপপরিচালক হিসেবে রয়েছেন রঘুনাথ সাহা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাটির গুণাগুণবিধ্বংসী কৃত্রিম সারের ব্যবহার কমিয়ে দেশে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অ্যাজোলা বড় সহায়ক হতে পারে। শুধু ধানে ব্যবহার নয়, মাছ-মুরগি ও গোখাদ্য হিসেবেও পুষ্টি উপাদানে ভরপুর অ্যাজোলা ব্যবহারের দারুণ সুযোগ আছে আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা করে দেখেছি, প্রতি ১ শতাংশ জায়গায় প্রতিদিন ১০ কেজি অ্যাজোলা উৎপাদন সম্ভব। চীন ও ভারতের মতো দেশ অ্যাজোলা ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে। টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করতে আমাদের দেশেও অ্যাজোলার দারুণ সম্ভাবনা আছে।’

অ্যাজোলার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার সময় এবং চাকরিজীবনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণে গিয়ে অ্যজোলার বিষয়ে জেনেছি। অনেক উন্নত দেশ এখন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে তাদের কৃষিব্যবস্থায় অ্যাজোলার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ধানখেতে সারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এটি আগাছা দমনে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া হাঁস-মুরগি, মাছ ও গরুর জন্যও পুষ্টিকর খাবার অ্যাজোলা।’ তিন বলেন, ‘অতি স্বল্প খরচে সহজে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন করা যায় বলে আমাদের দেশে কৃষক পর্যায়ে অ্যাজোলার ব্যবহার জনপ্রিয় করা সম্ভব। এতে কৃত্রিম সার ব্যবহার কমিয়ে অর্থসাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও বড় ভূমিকা রাখা যাবে।’

By user

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *